← সব লেখা

হুটহাট ভ্রমণ!

হুটহাট ভ্রমণ!

জাপানের ইওয়াতে প্রিফ্যাকচারের মরিওকা শহর যেন প্রকৃতির এক মোহময় চিত্রকর্ম। চারপাশে সুউচ্চ পাহাড়, শান্ত নদী, আর ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাওয়া প্রকৃতির রঙিন খেলা মনকে মুগ্ধ করে। শীতকালে বরফে ঢাকা রাস্তা, বসন্তে চেরি ফুলের বৃষ্টি, গ্রীষ্মে সবুজ বনভূমি আর শরতে আগুনরঙা পাতায় ছেয়ে যাওয়া পাহাড়—সব মিলিয়ে মরিওকা যেন প্রতিটি ঋতুতেই নতুন রূপ ধারণ করে। এখানে ব্যস্ততা কম, জীবনযাত্রা শান্ত। চারদিকে পরিচ্ছন্নতা আর শৃঙ্খলা। সকাল হলেই দেখা যায়, কর্মব্যস্ত মানুষজন ট্রেনে উঠে কাজে যাচ্ছে, স্কুলের বাচ্চারা পাকা রাস্তার ধারে লাইন ধরে হাঁটছে।

সেদিন ছিল শনিবার। জানুয়ারির শেষ দিক, বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা, কিন্তু দিগন্তজোড়া নীল আকাশ আর উজ্জ্বল রোদ দেখে মন ভরে যাচ্ছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই চোখে পড়ছিল বরফে ঢাকা শহর, সাদা তুলোর মতো রাস্তা আর গাছের ডালে জমে থাকা বরফের স্তর। মনে হচ্ছিল, পুরো শহর যেন কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা এক নিখুঁত জলরঙের চিত্রকর্ম। হুট করেই লিনু বলে উঠল, “চলো কোথাও ঘুরতে যাই!”

একেতো তার সেমিস্টার শেষ, তার ওপর এমন আবহাওয়া—বাসায় বসে থাকা একদম মানায় না। তানজিদ ভাই আগের দিনই বলে রেখেছিলেন, তিনি আজ ফ্রি। যদি কোনো প্ল্যান থাকে, যেন জানানো হয়। তাই সঙ্গে সঙ্গে পুস্পা আপুকে জানালাম যে আজ আমরা গাড়ি নয়, বরং জাপানের দুই বগির ছোট্ট কিউট ট্রেনে ঘুরব। উনি সঙ্গে সঙ্গেই রাজি!

একটু পর মামুন ভাইও ফোন দিলেন, ঘুম ঘুম চোখে বললেন, “আমিও যাবো, একটু অপেক্ষা করো!”

আমরা তখনও রেডি হইনি। তাড়াতাড়ি করে নাশতা সেরে, মোটা জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে বাসার নিচে নামলাম। দেখি, মামুন ভাই, মুনিয়া আপু, সঙ্গে তাদের ছোট্ট ছেলে মাহদী (চিগাও) তানজিদ ভাই আর পুস্পা আপু সবাই চলে এসেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কোথায় যাব?

আমার বাসার সামনে একটা ছোট্ট কাঠের তৈরি ট্রেন স্টেশন আছে। সেখানে গিয়ে সবাই মিলে রুট প্ল্যান নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। কোথায় যাব? কোন স্টেশনে নামবো? এসব নিয়ে বেশ মজা করছিলাম। কেউ বলল, কোমা স্টেশনে চল! কিন্তু নামটা একটু অদ্ভুত মনে হলো, তাই আমি বললাম, “তার চেয়ে একটা স্টেশন বেশি যাই, কাওয়াগুচি পর্যন্ত!”

সবাই রাজি হয়ে গেল। আমরা টিকিট কাটতে গেলাম। কিন্তু আমরা তো বাঙালি, টিকিট কাটার সময় একটু হইচই না করলে চলে? হাসাহাসি আর উত্তেজনার মধ্যে কথাবার্তা একটু জোরেই বলে ফেলছিলাম। আশপাশের কয়েকজন জাপানিজ বিরক্ত হয়ে তাকাতে শুরু করল। বুঝতে পেরে আমরা নিজেদের সংযত করলাম।

এভাবেই শুরু হলো আমাদের নতুন এক অভিজ্ঞতার যাত্রা, যেখানে অপেক্ষা করছিল আরও অনেক মজা, আনন্দ আর অবিস্মরণীয় মুহূর্ত!

হুটহাট ভ্রমণ!

টিকিট কাটার পর ছোট্ট দুই বগির ট্রেন এসে থামল। এমন ট্রেন বাংলাদেশে দেখা যায় না। ছোট, নিরিবিলি, কিন্তু একদম পরিষ্কার! আমরা চড়ে বসলাম। ঠিক ৩:৩০ এ ট্রেন এসে স্টেশনে থামল। জাপানে সময় মানে সময়, এক সেকেন্ডও দেরি নেই! আমাদের দেশে যেখানে ট্রেন বা বাস কখন আসবে, সেটার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, সেখানে এখানে সময়ের এত নিখুঁত হিসাব দেখে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি, কিন্তু তবুও অবাক হই।

ট্রেন ছাড়তেই জানালার বাইরে অপূর্ব দৃশ্য ভেসে উঠল—সাদা বরফে মোড়ানো মাঠ, দূরে পাহাড়ের সারি, আর রোদ ঝলমলে নীল আকাশ।

মামুন ভাই, তানজিদ ভাই আর ছোট্ট চিগাও ট্রেনের পাইলটের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যদিকে, লিনু, মুনিয়া আপু আর পুস্পা আপু ছবি তোলায় ব্যস্ত! ট্রেনের ভেতর থেকে জানালার বাইরে বরফে ঢাকা পথ, পাহাড় আর ছোট ছোট ঘরবাড়ির সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

হুটহাট ভ্রমণ!

ঠিক ২০-২৫ মিনিট পর, আমাদের ট্রেন গন্তব্যে এসে পৌঁছাল। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম, এই ছোট্ট ট্রিপটাও যেন এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করেছে। আমাদের সিচুয়েশন দেখে ট্রেনের পাইলট মুচকি হেসে চিগাও আর পুস্পা আপুকে ইংরেজিতে “বাই বাই” বলে চলে গেল।

হুটহাট ভ্রমণ!

স্টেশনে নামতেই আমরা অবাক হয়ে গেলাম। স্টেশনে নামতেই চারপাশে তাকিয়ে আমরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। পুরো এলাকা যেন এক সাদা বরফের চাদরে ঢাকা! চারদিকে ধবধবে সাদা বরফ, ট্রেনের প্ল্যাটফর্মের ধারে জমে থাকা তুষার, গাছের ডালে ঝুলে থাকা বরফের স্তর—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো স্বপ্নের রাজ্যে চলে এসেছি।

হুটহাট ভ্রমণ!

স্টেশনের ডিজাইনটা ছিল গোলাকার, এমন ব্যতিক্রমী স্টেশন আমরা আগে কখনো দেখিনি।

হুটহাট ভ্রমণ!

স্টেশনের পাশেই চোখে পড়ল একটা ছোট্ট কফি শপ। মনে হলো, গরম কফির কাপ হাতে নিয়ে বরফের এই সৌন্দর্য উপভোগ করাটা দারুণ হবে। তবে সময় কম থাকায় আমরা শুধু একটু দাঁড়িয়ে দেখলাম, আর কল্পনায় কফির উষ্ণতা অনুভব করলাম!

আরেকপাশে দেখলাম একটা পুরনো, পরিত্যক্ত বাসা। দেখে মনে হলো, বহু বছর ধরে এখানে কেউ থাকে না। বরফে ঢেকে যাওয়ায় বাসাটার একটা রহস্যময় সৌন্দর্য তৈরি হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এটা যেন কোনো পুরোনো সিনেমার সেট!

হুটহাট ভ্রমণ!

কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম, চারপাশের প্রকৃতিকে আপন করে নিলাম, আর এই ছোট্ট ট্রিপের প্রতিটা মুহূর্তকে মনে রাখার মতো করে উপভোগ করলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা আবার ট্রেন ধরে কুরিয়াগাওয়া স্টেশনে ফিরে এলাম।

জীবনের আসল আনন্দ হয়তো এভাবেই পাওয়া যায়—হুট করে বেরিয়ে পড়া, দারুণ কিছু মুহূর্ত তৈরি করা, আর স্মৃতির ঝুলিতে চমৎকার অভিজ্ঞতা জমা করা!

Assistant Professor Ashraf Uddin Fahim

প্রথম লাইক দিন

নতুন লেখা

জাপান প্রবাসে

জাপানের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ

জাপানের যেখানেই থাকুন — নতুন এসেছেন বা অনেক দিন ধরে আছেন — এই সাইট আপনার জন্য। সম্পূর্ণ ফ্রি, বাংলা, English সহ নানা ভাষায়। আসুন, একে অপরের পাশে থাকি।

  • 🕌 নামাজের সময় ও আজান
  • মরিওকা মসজিদ
  • 🔍 হালাল খাবার যাচাই
  • 🗑️ ময়লা ফেলার নিয়ম
  • 🧭 নতুনদের গাইড
  • 📺 টিভি
  • ✍️ নিজের লেখা প্রকাশ

আমাদের সাথে থাকুন

© Iwate Bangladesh Exchange Association

আজকের দর্শক … মোট দর্শক …
Iwate-BD Chatbot
হ্যালো! আমি বাংলাদেশ কমিউনিটির ওয়েবসাইটের সহকারী। আমাকে এই সাইট সম্পর্কে যে কোন প্রশ্ন করতে পারবেন। আজ আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?