ক্লিনিকের দিনলিপি—ইতো সানকে মনে রেখে…
ইতো সানকে নিয়ে আগের পোস্টে কিছু কথা লিখেছিলাম, কিন্তু তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই আজকের লেখাটা তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে।
তিনি আমাদের রোগী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমাদের প্রতিদিনই দেখা হতো। কারণ, তিনি তাঁর স্বামীকে দেখতে দিনে প্রায় দুবার ক্লিনিকে আসতেন। আবহাওয়া খারাপ থাকলে হয়তো একবার আসতেন, কিন্তু ক্লিনিকে এসে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন।
আগেই বলেছিলাম, ইতো সান একটু অস্থির ধরনের মানুষ ছিলেন। ক্লিনিকে খুব বেশি মানুষের কথা শুনতেন না। নিজের মতো থাকতেই পছন্দ করতেন। তাঁর ক্লিনিকের রুমটা তিনি প্রায় বাড়ির ঘরের মতো করে সাজিয়ে ফেলেছিলেন। রুমে দুটো সাউন্ড বক্সসহ মিউজিক সিস্টেম ছিল। সারা দিন গান শুনতেন। রুমটা দেখে কখনো কখনো মনে হতো না যে এটা হাসপাতালের একটি রুম। তাঁর প্রায় সব জিনিসই বিছানার ওপর থাকত। আর তিনি নিজে বিছানার এক কোণে ঘুমাতেন।
তাই তাঁর স্ত্রী ক্লিনিকে এলে বিছানাটা গুছিয়ে দিতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে যেত।
একদিন আমি কিছু ওষুধ আর খালি বাক্স নিয়ে ইতো সানের রুমে গিয়ে তাঁকে দিয়েছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম, “ইতো সান, তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতে অনেক সময় লাগে। তুমি এই বাক্সে জিনিসগুলো রাখলে সময়টা একটু কম লাগবে।”
আমার কথা শুনে তিনি হেসে দিয়েছিলেন। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, তাঁর স্ত্রী এই বাক্স দেখে খুশি হবেন। এরপর আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন।
তাঁর স্ত্রী এসে প্রতিদিনই তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতেন। গুছাতে গুছাতে ইতো সানকে বকাঝকাও করতেন। কিন্তু পরের দিন আবার আসতেন, আবার সবকিছু গুছিয়ে দিতেন। এভাবেই প্রতিদিন চলত তাঁদের জীবনের ছোট্ট একটি অধ্যায়।
আবার তাঁর স্ত্রী যখন ক্লিনিকে আসার পথে থাকতেন, তখন ইতো সানের রুমে যাওয়ার আগেই ভয়ে ভয়ে সবার কাছে জানতে চাইতেন, “আজ ইতো সান কোনো উল্টাপাল্টা কিছু করেছেন নাকি?”
কথাটা মনে পড়লে এখনো মনে হয়, এর মধ্যেও কত মায়া লুকিয়ে ছিল! স্বামীকে নিয়ে তাঁর কত চিন্তা, কত দুশ্চিন্তা! প্রতিদিন একই মানুষকে সামলানো, তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে দেওয়া, তাঁর সবকিছু খেয়াল রাখা|
ইতো সানের স্ত্রীর বয়সও হয়তো ৭০–৮০ বছরের কাছাকাছি হবে। হাঁটাচলা করতে তাঁর বেশ কষ্ট হতো।এত বয়সেও নিজেই গাড়ি চালিয়ে ক্লিনিকে আসতেন।
হাসপাতালে থাকাকালে ইতো সান তাঁর পোশাক অনেক ময়লা করে ফেলতেন। আবার তিনি অনেক ধরনের স্ন্যাকসও খেতেন। তাই তাঁর স্ত্রী জাপানে বয়স্ক মানুষদের ব্যবহার করতে দেখা যায়—এমন চাকা লাগানো একটি ব্যাগ নিয়ে আসতেন। ব্যাগটিতে ইতো সানের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে আসতেন। বয়সের ভারে ধীরে ধীরে হাঁটতেন, হাঁটতে কষ্ট হতো, তবুও নিজের হাতে সবকিছু নিয়ে আসতেন তাঁর স্বামীর জন্য।
দূর থেকে দেখলে হয়তো এগুলো খুব সাধারণ কিছু ঘটনা মনে হবে। কিন্তু প্রতিদিনের এই ছোট ছোট কাজের মধ্যেই যে কতটা দায়িত্ব, মায়া আর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, তা কাছ থেকে না দেখলে হয়তো বোঝা যায় না।
ইতো সানের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর এই প্রতিদিনের দেখা করতে আসা, তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে দেওয়া, বকাঝকা করা, আবার পরের দিনও ঠিক চলে আসা—এই দৃশ্যগুলো আমার মনে থেকে যাবে।
ভালোবাসা হয়তো সব সময় সুন্দর সুন্দর কথা দিয়ে প্রকাশ করতে হয় না। কখনো কখনো ভালোবাসা প্রকাশ পায় প্রতিদিনের একই কাজের মধ্যে, হাজারটা বিরক্তির মধ্যেও পাশে থেকে যাওয়ার মধ্যে, আর বয়সের ভারে নিজের হাঁটতে কষ্ট হলেও প্রিয় মানুষটির জন্য সবকিছু নিয়ে ছুটে আসার মধ্যে।
ইতো সান আল্লাহর কাছে চলে যাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তাঁর স্ত্রীর একটি পায়ে অপারেশন করার প্রয়োজন হয়েছিল। তাই তাঁকে অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
তিনি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে আমাদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে দূরে থাকতেন, তাই প্রতিদিন এসে বাবাকে দেখাশোনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইতো সানের খাবার, স্ন্যাকস, কাপড়চোপড়—এসব কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে তাঁর স্ত্রী খুব চিন্তিত ছিলেন।
আমাদের ক্লিনিকের লন্ড্রি সার্ভিসের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি ছিল। তাই সেই সার্ভিসে ইতো সানের নামও যুক্ত করে দেওয়া হলো। এ ছাড়া আমাদের ক্লিনিকে কিছু ক্যানসার রোগী ছিলেন, যাঁরা সোশ্যাল ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের বলা হলো, যেন প্রতি সপ্তাহে ইতো সানের জন্য স্ন্যাকস কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ইতো সান তাঁদের সেই খরচ দিয়ে দেবেন।এভাবে মোটামুটি সব সমস্যার সমাধান করা হলো।
এরপর তাঁর স্ত্রী নিজের অপারেশনের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার শেষ দিনে ক্লিনিকের সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। সেদিন তিনি একাই আমাদের সবার জন্য জুস নিয়ে এসেছিলেন।
কিন্তু এরপর শুরু হলো ইতো সানের একাকী দিনগুলো।
তাঁর স্ত্রীর পায়ের অপারেশন হলো। নতুন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ইতো সান আমাদের জানিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী পায়ের নড়াচড়া ঠিক করার জন্য থেরাপি নিচ্ছেন। কিন্তু স্ত্রী হাসপাতালে থাকার কারণে তাঁদের নিজেদের মধ্যে আর কথা হতো না। ইতো সানের কাছে যে মোবাইল ফোনটি ছিল, তাতে সিম কার্ডও ছিল না। তাই তিনি নিজে স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন না। ক্লিনিক থেকে হাসপাতালে যোগাযোগ করে তাঁর স্ত্রীর খবর নেওয়া হতো, আর সেই খবর ইতো সানকে জানানো হতো।
এরপর এলো সেই দিন, যেদিন রাতে ইতো সানকে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন দিতে হয়েছিল।
তার পরদিন সকালে তাঁর স্ত্রী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ক্লিনিকে এলেন। সেদিন তাঁর এক ছেলেও এসেছিলেন।
আমি যখন ইতো সানের রুমে গেলাম, তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, “এখন কেমন আছেন?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “এখন ভালো।”
আমি তাঁকে বললাম, “ইতো সান ভালো হয়ে যাবেন।”
তখন তিনি আমাকে বললেন, ইতো সান তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন, কিন্তু উচ্চমাত্রার অক্সিজেন মাস্কের কারণে কথা বলতে পারছেন না।
আমি তখন ইতো সানের দিকে তাকালাম। আমার মনে হলো, তিনি আসলে কথা বলার চেষ্টা করছেন না; বরং শ্বাস নিতে এতটাই কষ্ট হচ্ছিল যে তাঁর শরীরটা একটু হালকা করার চেষ্টা করছিলেন। চোখ দুটোও সামান্য খোলা ছিল। শরীরে হালকা জ্বরও ছিল।
আমি ইতো সানের স্ত্রীকে বললাম, “আপনি ওনার সঙ্গে কথা বলতে থাকুন। ইতো সান ভালো হয়ে যাবেন।”
সেদিন তাঁর স্ত্রী অনেকক্ষণ ইতো সানের পাশে ছিলেন।
কিন্তু কে জানত, এটাই হবে তাঁদের শেষ দেখা!
ইতো সান সুস্থ অবস্থায় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আর শেষবারের মতো দেখা করার সুযোগ পেলেন না। যে স্ত্রী প্রতিদিন তাঁকে দেখতে ক্লিনিকে আসতেন, তাঁর এলোমেলো জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতেন, বকাঝকা করতেন, আবার পরদিনও ঠিক চলে আসতেন—সেই মানুষটির সঙ্গে আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলা হলো না।
পরের দিনই ইতো সান আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
জীবন কখন, কীভাবে আমাদের কাছ থেকে প্রিয় মানুষদের দূরে সরিয়ে নেয়, তা আমরা কেউ জানি না। প্রতিদিনের পরিচিত মুখ, ছোট ছোট অভ্যাস, সামান্য বকাঝকা—একসময় এসবই স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।
আল্লাহ ইতো সানকে ক্ষমা করুন, তাঁর প্রতি রহম করুন এবং তাঁর স্ত্রী ও পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিন। আমিন।





মন্তব্য